শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ • ১:৪৯:২৫ PM
|
|
এখন সাইটে সংবাদ পড়ছেন ০ জন
এই খবর পড়ছেন ০ জন

রবীন্দ্রসুরের মায়ায় অনন্ত এক উপস্থিতি সাদি মহম্মদ

ফিচার বাংলা
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬ | 05:58 AM | পড়তে সময় ৬ মিনিট | মন্তব্য ০

তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না—মনের ভেতর  নির্মল এক আলো জ্বেলে দেয়। সেই কণ্ঠ থেকে বলা কথাগুলোও কবিতার মতো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনেন অনুরাগীরা।  রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সাদি মহম্মদ ছিলেন তেমনই এক শিল্পী। তাঁর গাওয়া শুধু গান নয়, তাঁর বলা কথাগুলোও মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতো। সাদি মহম্মদের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান পেয়েছিল গভীর আবেগ, সংযম, স্বচ্ছ উচ্চারণ ও নিজস্ব এক সৌন্দর্য। গায়ক হিসেবে তিনি যেমন খ্যাতিমান, তেমনি শিক্ষক, সুরকার ও সংগীত-সংগঠক হিসেবেও রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর, এই দিনে তিনি প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে, সুরের সুধা রাঙিয়ে এক স্নিগ্ধ আলোকবর্তিকা হয়ে এ ধরায় আসেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নির্মমভাবে হত্যা করে সাদির বাবা সলিমউল্লাহকে।  ঢাকার মোহাম্মদপুরের সলিমউল্লাহ রোডের নামকরণ করা হয় তাঁর বাবার নামে। সাদি মহম্মদের ছোট ভাই শিবলী মোহাম্মদ বাংলাদেশের একজন বরেণ্য নৃত্যশিল্পী। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব।  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, পরিবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর জীবনবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

প্রকৌশল থেকে সংগীতের পথে..

জীবনের শুরু থেকে নানা বাঁকে মোড় নেয় তার জীবনের পথ। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন সাদি মহম্মদ।। কিন্তু সংগীতের প্রতি গভীর টান শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। ১৯৭৫ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পড়তে যান। সেখানে সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা।

বিশ্বভারতীতে তিনি রবীন্দ্রসংগীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শান্তিদেব ঘোষ ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রখ্যাত শিল্পী ও শিক্ষকের কাছে তিনি সংগীতের তালিম নেন। শান্তিনিকেতনের সেই শিক্ষাজীবন তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে নির্মাণ করে।

নিজের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন ‘সৃষ্টিকর্তাকে বুঝতে পারলে কোন কষ্টই আর কষ্ট থাকে নারে’। সংগীত তাঁর কাছে শুধু চর্চার বিষয় ছিল না; ছিল জীবনবোধের অংশ।

https://www.facebook.com/share/v/1bsURjxv4y/

রবীন্দ্রসংগীতের এক নিবেদিত প্রাণ

দেশে ফিরে সাদি মহম্মদ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে রবীন্দ্রসংগীতের সাধনায় নিয়োজিত করেন। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান নতুন করে শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

তাঁর গায়কীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শব্দের প্রতি গভীর যত্ন। গানকে কেবল সুর ও কণ্ঠের পরিবেশনা হিসেবে নয়, কবিতার ভাব ও দর্শনকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন তিনি।

সাদি মহম্মদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কেবল একজন কবি বা গীতিকার নন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের মধ্যেই তিনি তাঁর জীবনের হাসি-আনন্দ, সুখ-দুঃখ ও জীবনযাপনের অনেক কিছু খুঁজে পান।

শিক্ষক সাদি মহম্মদ

শিল্পী সাদি মহম্মদের আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত শিক্ষক।

দেশে ফিরে তিনি সরকারি সংগীত কলেজে শিক্ষকতা করেন এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রজন্ম তৈরি করার কাজে যুক্ত থাকেন। অবসর নেওয়ার পরও তাঁর সংগীত-শিক্ষাদান থেমে যায়নি; নিজের বাসাতেও তিনি শিক্ষার্থীদের গান শেখাতেন।

তাঁর কাছে গান শেখা মানে শুধু স্বরলিপি বা সুর আয়ত্ত করা নয়। শিল্পীর প্রতি সততা, নিয়মিত চর্চা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্নিহিত ভাবকে বোঝার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, তাঁর গুরুরা যেভাবে মন দিয়ে তাঁকে শিখিয়েছেন, তিনিও একই নিষ্ঠায় তাঁর ছাত্রছাত্রীদের শেখাতে চান।

তাঁর নিজ হাতে গড়া সংগীত সংগঠন ‘রবিরাগ’ ও ‘ভোরের আলোয়’র নিরন্তর পথ চলা..

রবীন্দ্রসংগীতকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নতুন শিল্পীদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সাদি মহম্মদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘রবিরাগ’  এবং পরে ভোরের আলোয়’ সংগীতচর্চা ও পরিবেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। সাদি মহম্মদ সেখানে বহু শিল্পীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং শ্রোতার আসর আয়োজন করেছেন।

নতুন শিল্পীদের সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর সংগীতচর্চার লক্ষ্য ছিল শুধু নিজের শিল্পীজীবনকে সমৃদ্ধ করা নয়; বরং রবীন্দ্রসংগীতের ধারাটিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

 সুরকার সাদি

সাদি মহম্মদ শুধু রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ছিলেন না; সুরকার হিসেবেও তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়। ২০০৭ সালে ‘আমাকে খুঁজে পাবে ভোরের শিশিরে’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘শ্রাবণ আকাশে’ এবং ২০১২ সালে ‘সার্থক জনম আমার’।

এ ছাড়া চলচ্চিত্র ও নাটকে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবেও তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে রবীন্দ্রসংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা সংগীতের বৃহত্তর পরিসরেও তাঁর কাজের উপস্থিতি ছিল।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

দীর্ঘ সংগীতজীবনে সাদি মহম্মদ পেয়েছেন বহু সম্মাননা। ২০১২ সালে তিনি চ্যানেল আইয়ের ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ প্রদান করে।

তবে পুরস্কার ও স্বীকৃতির বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অসংখ্য শ্রোতার ভালোবাসা এবং একদল শিক্ষার্থীর কাছে তাঁর সংগীত-আদর্শকে পৌঁছে দেওয়া।

ব্যক্তিজীবনের আড়ালে এক সংবেদনশীল মানুষ

শিল্পী সাদি মহম্মদের ব্যক্তিত্বের একটি বড় দিক ছিল তাঁর গভীর সংবেদনশীলতা। পরিবার, বিশেষ করে মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। ২০১৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের মুখ দেখতে চাইতেন।

তাঁর জীবন ছিল সংগীতনির্ভর, কিন্তু সেই সংগীতের ভেতরেই ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সম্পর্কের টান এবং গভীর অনুভব।

চলে গিয়েও থেকে গেলেন গানে

২০২৪ সালের ১৩ মার্চ স্বেচ্ছায় অনন্তঅসীমে চলে যান স্বাত্তিক সাদি মহম্মদ। তাঁর চলে যাওয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তৈরি করে গভীর শূন্যতা।

কিন্তু একজন সত্যিকারের শিল্পীর জীবন তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা গান থেকে যায়, তাঁর শেখানো শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে তাঁর সংগীতদর্শন বেঁচে থাকে, আর তাঁর গড়ে তোলা সংগীতচর্চার ধারায় নতুন প্রজন্ম তাঁকে খুঁজে পায়।

সাদি মহম্মদ ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে শুধু গেয়ে যাননি—নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করেছেন। তাঁর কাছে রবীন্দ্রসংগীত ছিল সাধনা, শিক্ষকতা ছিল দায়বদ্ধতা আর গান ছিল জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক গভীর সত্য।

তাই সাদি মহম্মদকে স্মরণ করলে কেবল একজন গুণী রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীর কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে একজন নিবেদিত শিক্ষক, সংগীতসাধক, সুরকার ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের কথা।

শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, শিক্ষক হিসেবেও তিনি গড়ে তুলেছেন বহু সংগীতশিল্পী ও অনুরাগীকে। রবীন্দ্রসংগীতের শুদ্ধ উচ্চারণ, বাণী ও সুরের প্রতি তাঁর যত্ন ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর  ছাত্র-ছাত্রীদের শিখিয়েছেন গানকে কীভাবে অনুভব করতে হয়, শব্দের ভেতরের অর্থ কীভাবে ধরতে হয়, সুরের প্রতি কীভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। রবীন্দ্রসংগীত তাঁর কাছে শুধু গাওয়া কিছু গান ছিল না; ছিল জীবনবোধ, সৌন্দর্য, শুদ্ধতা আর আত্মঅনুসন্ধানের এক অনন্ত পথ।

কখনো শিক্ষক, কখনো অভিভাবক—কখনো বা একেবারে পিতার মতো আগলে রেখেছেন তার সন্তানতুল্য শিষ্যদের। তাঁর নিজ হাতে গড়া সংগীত সংগঠন ‘রবিরাগ’ ও ‘ভোরের আলোয়’র ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও দেশ-বিদেশে অসংখ্য অনুরাগী,  শিষ্যদের কণ্ঠে, হৃদয়ে অশ্রুসিক্ত স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল সাদি মহম্মদ।

https://youtu.be/CHDkyH6CLyU?si=jb8w7iNYITf6HbaR

পাঠকের মন্তব্য

০
এখনও কোনো মন্তব্য নেই সংবাদটি নিয়ে আপনার মতামত জানিয়ে প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত জানান

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য অ্যাডমিনের অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

Scroll to Top