এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর…
লক্ষ্মীপেঁচা শঙ্খচিল রূপসী বাংলার
কবি জীবনানন্দ দাশ
হেমন্তের তারাভরা রাতে নিঃশব্দে ফুরিয়েছিল জীবনানন্দ দাশের জীবনকাল। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর দীর্ঘ আট দিন হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২২ অক্টোবর তিনি একা পায়ে চলে গেলেন অনন্ত নক্ষত্রলোকে। রূপসী বাংলার এই প্রধান কবির প্রয়াণতিথিতে শ্রদ্ধা-অবনত চিত্তে স্মরণ করি তাঁর অবিনাশী সৃষ্টিকে।
মৃত্যুর পর সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে; অথচ বাংলা কবিতার মানচিত্রে জীবনানন্দের উপস্থিতি এখনো একক ও অনতিক্রম্য। তিনি ছিলেন মূলত সময়ের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা এক দ্রষ্টা কবি। তাঁর সমসাময়িক সমাজ ও সাহিত্যিক পরিমণ্ডল যখন গতানুগতিক ছকে আবদ্ধ, তখন তিনি বাংলা কবিতায় আধুনিক মনস্তত্ত্ব, নিসর্গ এবং অস্তিত্বের সংকটকে মূর্ত করে তুলেছিলেন।
তবে কি তিনি আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন তাঁর প্রস্থানের পথ? জীবনানন্দের বিখ্যাত ‘ফুটপাতে’ কবিতার পংক্তিগুলো আজ এক আশ্চর্য ও মর্মান্তিক ছায়ার মতো গায়ে এসে লাগে—
‘অনেক গভীর রাত হয়েছে; কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথ-ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে- কয়েকটি আদিম সর্পিণী সহোদরার মতো এই-যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে এদের বিষাক্ত বিষাদস্পর্শ অনুভব ক’রে হাঁটছি আমি।’
নগরের যান্ত্রিক ট্রামলাইনকে কবি যেভাবে ‘আদিম সর্পিণী’ ও ‘বিষাক্ত বিষ্বাদ’ হিসেবে দেখেছিলেন, বাস্তব জীবনের নির্মম পরিণতিতে ঠিক সেই ট্রামলাইনেই থেমে গিয়েছিল তাঁর রক্তপ্রবাহ। এটি নিছক কাকতালীয় কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টি নাকি নিয়তির অবধারিত কোনো লিপি— পাঠক আজও সেই রহস্যের সামনে এসে স্তব্ধ হয়।
ব্রাহ্মপরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও, পারিবারিক ও সামাজিক আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর মনন বিকশিত হয়েছিল মানববাদের টানে। প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত ধর্মীয় সীমানার চেয়ে মানুষের নীতিবোধ, সহমর্মিতা এবং মানবসত্তার জয়গানই ছিল তাঁর উপলব্ধির কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর মনন ও সৃষ্টিতে বারবার ফুটে উঠেছে সেই মহাজিজ্ঞাসা, যেখানে ধর্ম বা তত্ত্বের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানব ও তার জীবনসংকট।
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি (৩ ফাল্গুন, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন; বরিশালের শহরের বগুড়া রোডে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল,স্নিগ্ধ রূপেই গড়ে উঠেছিল তাঁর কবিমানস। তাঁর বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন (বি.এম.) স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক, আর মা কুসুমকুমারী দেবী ছিলেন প্রথিতযশা কবি (তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’)। মায়ের কাছ থেকেই তিনি প্রথম কাব্যচর্চার প্রেরণা লাভ করেন। জীবনানন্দ ১৯১৭ সালে ব্রজমোহন স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ১৯১৯ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই.এ. পাস করেন; এরপর কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯২১ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. এবং ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
জীবনানন্দের ব্যক্তিগত জীবন কখনো মসৃণ ছিল না। দীর্ঘ বেকারত্ব তাঁকে গ্রাস করেছিল চরম আশঙ্কায়। জীবিকার তাগিদে কখনো দিল্লির রামজশ কলেজে, কখনো কলকাতার বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করলেও নানা অসঙ্গতি ও কোন্দলের কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চাকরি হারিয়ে এবং নামী কাগজগুলোতে অবমূল্যায়িত হয়ে তাঁকে চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটাতে হয়েছে। বেকার জীবনের এই দুর্বিষহ অবস্থাকে তিনি নিজেই এক জায়গায় তুলনা করেছিলেন— অর্থহীনতার সেই যন্ত্রণাকে তিনি এঁদো কাদায় পড়ে থাকা শুয়োরের বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করতেও দ্বিধা করেননি। সামান্য একটি চাকরির জন্য তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় চরম অপমান ও নতজানু হওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা তাঁর আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল।
জীবদ্দশায় তাঁকে কম হেয়প্রতিপন্ন হতে হয়নি। রক্ষণশীল সাহিত্যিক ও সমালোচকদের একাংশ তাঁকে নিয়ে তীব্র কটূক্তি করতেন। সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে তাঁকে নানা অবমাননাকর বিশেষণে বা নাম বিকৃত করে আক্রমণ করা হতো। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার সময় তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাভাবিক চলাফেরার ওপর নজরদারি চালানোর মতো অমানবিক ও অবমাননাকর পরিস্থিতির মুখোমুখিও তাঁকে হতে হয়েছিল।জীবনানন্দ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ ডাকযোগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পাঠিয়েছিলেন মন্তব্যের আশায়। চিঠির উত্তর দেওয়ার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের নিষ্ঠা থাকলেও, তরুণ জীবনানন্দকে লেখা তাঁর চিঠিটি ছিল বেশ কড়া ও রূঢ়। রবীন্দ্রনাথ সেখানে স্বীকার করেছিলেন যে জীবনানন্দের ‘কবিত্বশক্তি আছে’, কিন্তু একইসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন— “ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারি নে। কাব্যের মুদ্রা দোষটা ওস্তাদীকে পরিহাসিত করে”। বিশ্ববরেণ্য কবির কাছ থেকে এমন কড়া তিরস্কার পাওয়ার পরও মফস্বলের তরুণ জীবনানন্দ চুপসে যাননি বা তা নিদ্বির্ধায় মেনে নেননি; বরং রবীন্দ্রনাথের সেই তিন লাইনের চিঠির এক দীর্ঘ ও দৃঢ় জবাব দিয়ে তিনি নিজের সাহিত্য ভাবনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে তিনি কাব্যগ্রন্থটি সাহিত্যিক ও সমালোচক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পাঠালে, ধূর্জটিপ্রসাদ পাওয়ার মাত্রই একটি প্রাপ্তিস্বীকারমূলক উত্তর দেন; তবে তিনি কবিতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। চিঠিতে জীবনানন্দ দাশের নামের জায়গায় তিনি ‘জীবানন্দ’ লিখেছিলেন। এতে অবশ্য জীবনানন্দ দাশ কিছুটা চটেছিলেন। তবে আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেও দেখতে পারি। কারণ উক্ত বানানকৃত ব্যক্তি ‘জীবানন্দ’ ছিলেন একজন বিখ্যাত সাহিত্য পণ্ডিত ও ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় টীকাসহ ১০৭ খানি সংস্কৃত বই প্রকাশ করেছিলেন; এমনকি তিনি মহাকবি কালিদাসের রচনারও অন্যতম টীকাকার ছিলেন। তখন তো জীবনানন্দ নামটি পরিচিত ছিল না, বরং একজন সাহিত্য সমালোচকের নিকট ‘জীবানন্দ’ নামটি মাথায় আসা স্বাভাবিক।
পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনও তাঁকে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি দেয়নি। বিবাহিত জীবন কখনো সুগম হয়নি; বরং পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব এবং সংসারের বাস্তব অর্থনৈতিক সংকট তাঁদের সম্পর্ককে এক নড়বড়ে জায়গায় দাঁড় করিয়েছিল। স্ত্রীর দিক থেকে কবিতার প্রতি অনীহা এবং সংসারের টানাপোড়েন তাঁকে মানসিকভাবে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে। নিজের ব্যক্তিগত টীকায় ও নোটসে তিনি এই সম্পর্কের ভাঙন ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কথা অকপটে প্রকাশ করেছিলেন। ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে মূলত তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পই ফুটে উঠেছে—উপন্যাসের ‘মাল্যবান’ চরিত্রে তিনি নিজে, আর তাঁর স্ত্রী লাবণ্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে ‘উৎপলা’ চরিত্রটি।
জীবনানন্দের কবিতায় মানুষের অবচেতন মন, গহীন যন্ত্রণাবোধ এবং অস্তিত্বের সংকট যে মাত্রায় ধরা দিয়েছে, তার অনন্য দৃষ্টান্ত তাঁর ‘ক্যাম্পে’, ‘বোধ’, ‘অন্ধকার’ ও ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাগুলো।
বিশেষ করে ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় কবি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকার কষ্ট, না-পাওয়ার তীব্র বেদনা এবং অন্তর্মুখী সত্তার গোপন আক্ষেপকে এক অনন্য রূপকে অবয়ব দিয়েছেন। শোভনার প্রতি তাঁর আজন্ম না-পাওয়ার বেদনা, প্রত্যাখ্যানের ক্ষত এবং কাম-বাসনার তীব্র শরীরী আকুলতা এই কবিতায় হরিণ ও ঘাইহরিণীর রূপকে মূর্ত হয়ে উঠেছে। মানুষ যেমন সমস্ত সংযম ভুলে তার নোনা নারীর টানে ছুটে যায়, কবিও তেমনি তার আরাধ্যের পিছু নিয়েছিলেন; কিন্তু বিনিময়ে জুটেছে কেবল বন্দুকের গুলির মতো নির্মম আঘাত ও নিঃসঙ্গতা। জীবদ্দশায় অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক ও শরীরী সত্যগুলোকে উন্মোচন করার দায়ে রক্ষণশীল সমাজ তাঁকে ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগে তীব্র হেনস্তা করেছিল, যা তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনকে আরও বিষিয়ে তুলেছিল। কিন্তু সমস্ত প্রত্যাখ্যান ও অপমানের চরম পরিণতি ধরা দেয় সেই পংক্তিতে— “বসন্তের জ্যোৎস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো আমরা সবাই।”
অন্যদিকে, ‘বোধ’ কবিতায় মূর্ত হয়েছে সৃষ্টিশীল মানুষের এক অভিশাপ ও মানসিক দহন। সাধারণ মানুষ যেভাবে জীবনযাপন, সংসারে স্বস্তি খুঁজে পায়, কবির মাথার ভেতরের ‘বোধ’ বা তীব্র আত্মসচেতনতা তাঁকে সেই সহজ প্রাত্যহিকতায় বাঁচতে দেয় না। এমনকি যে প্রেম ও ভালোবাসাকে মানুষ পরম আশ্রয় মনে করে, কবির কাছে তা-ও শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে “ধুলো আর কাদা”। এই ‘বোধ’ কবিকে চিরস্থায়ী একাকী করে রাখে এবং বাধ্য করে সমাজের গোপন ব্যাধি, অন্ধত্ব আর মানুষের আত্মিক পচনকে প্রত্যক্ষ করতে।
‘অন্ধকার’ কবিতায় কবি আলোকময় কোলাহলপূর্ণ দুনিয়া থেকে সরে এসে অন্ধকারের শান্ত ও প্রগাঢ় আশ্রয়ের খোঁজ করেছেন। পৃথিবীর সকল জটিলতা, হিসাব-নিকাশ আর যান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে অন্ধকার যেন এক পরম শান্তির লগ্ন বয়ে আনে। মানুষের ভিড় ও ব্যস্ততা যখন ক্লান্ত করে তোলে, তখন অন্ধকারের নিবিড় চাদরই হয়ে ওঠে কবির একমাত্র বিশ্বস্ত ঠিকানা।
আর ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় জীবনানন্দের জীবনদর্শনের চরম রূপ প্রকাশ পেয়েছে। সমাজ-সংসারের সাধারণ সুখ, ঘরকন্না কিংবা প্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে জীবনের গভীরতম অর্থ ও আত্মহননের মধ্য দিয়ে মুক্তি খোঁজার এক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এখানে উন্মোচিত হয়েছে। সমাজের প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে জীবনকে অন্য এক শূন্যতায় দেখার যে বেদনা, তার পরিচয় মেলে এই পংক্তিগুলোতে—
শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,
সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধূ
মধু— আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্রানি বেদনার শীতে
এ-জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাসকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।
জানি— তবু জানি
নারীর হৃদয়— প্রেম— শিশু— গৃহ– নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত— ক্লান্ত করে;
লাসকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাসকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।
বনলতা সেন কবিতায় বিম্বিসার-অশোকের যুগ কিংবা প্রাচীন বিদর্ভ নগরের ধূলিমলিন ইতিহাসের মধ্য দিয়ে হাজার বছর ধরে হেঁটে আসা কবি নিজেকে ‘ক্লান্ত প্রাণ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে চারপাশের অশান্ত ও ফেনিল জীবন তাঁকে চরম ক্লান্ত করে তুলেছে; আর এই দীর্ঘ পথচলা ও অস্তিত্বের চরম ক্লান্তির বিপরীতে ‘নাটোরের বনলতা সেন’ কোনো সাধারণ নারী নন—তিনি সমস্ত যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে কবিকে দেওয়া এক সুকোমল ও পরম প্রশান্তিময় নীড়।
ধানসিড়ি, ধলেশ্বরী, জলাঙ্গী, গাঙুড় কিংবা রূপসার মতো থমথমে নদীগুলো তাঁর রূপকল্পে অমর হয়ে আছে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে তিনি চিনেছিলেন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য গভীর অনুভবে—সেখানে জড়িয়ে আছে সোঁদা ঘাস, কামরাঙা-লাল মেঘ, নাটাফল, চালতাফুল, শটিবন, আকন্দ কিংবা হিজল-বটের পরম স্নিগ্ধতা। নিসর্গের সাধারণ ও তুচ্ছ পাখিরাও তাঁর কাব্যসংসারে পেয়েছিল অনন্য আসন; লক্ষ্মীপেঁচা, শঙ্খচিল, গুবরে পোকা, বক, কিংবা সন্ধ্যামুখের খয়েরি শালিখ কবির একাকী জীবনের বিশ্বস্ত দোসর হয়ে উঠেছে। ‘তাঁর প্রায় সব কবিতার পংক্তিতে নিসর্গ এবং বাংলার মাটির প্রতি তাঁর আজন্ম নাড়ির টান অমর হয়ে আছে — “তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও— আমি এই বাংলার পরে র’য়ে যাব; দেখিবো কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে…”
যে-নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার-হাজার বছর আগে ম’রে গিয়েছে, তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে ক’রে এনেছে; জীবনানন্দ দাশ ছাড়া বাংলা কিংবা বিশ্বসাহিত্যে এমন নক্ষত্রলোক, মৃত মহাকাল এবং জানালার ফ্রেমে অতীতের অবক্ষয়কে একসঙ্গে মিলিয়ে এমন নিঃসঙ্গ ও গভীর ভাষায় কেউ লিখতে পেরেছেন কি না—তা এক বিরাট প্রশ্ন। তাঁর কবিতায় বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির রূপ পাঠকের মনে এক দোলা দেয়—যা রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে। প্রকৃতির উপাদানে চিত্রকল্প নির্মাণে কবি জীবনানন্দ দাশের পঞ্চইন্দ্রিয় সতত ও সমভাবে সক্রিয়।‘বাঙালী নারীর কাছে-চাল-ধোয়া স্নিগ্ধ হাত, ধান-মাখা চুল, হাতে তার শাড়িটির কস্তা পাড়, ডাঁশা আম কামরাঙা কুল। আহা, কে পেরেছে এমন লিখতে!
“মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়”—কবি জীবনানন্দ দাশের এই অবিনাশী উচ্চারণের মতোই তিনি আজও আমাদের চেতনায় ও অনুভবে রূপময় হয়ে আছেন, “তিনি আমাদের মাঝে আছেন। আমাদের বোধের পরিমাপ নিয়ে তিনি চলেছেন।
–
কে এম হাসান : সাংস্কৃতিক কর্মী, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল
এ সম্পর্কিত
আন্তর্জাতিক সাইবার হামলার শঙ্কা
ওয়েবসাইট শাটডাউন, জরুরি সতর্কতা বাংলাদেশেও বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত প...
অন্য কেউ হলে সুইসাইড করতো: চিত্রনায়িকা পরীমনি
সারাজীবন কপালে ঝামেলাই লেখা, এনজয় করি: পরীমনি ফিচার বাংলা ডেস্ক ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত আর নি...
‘থিয়েটার ফ্যাক্টরি’র নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
৯ পেরিয়ে ১০-এ পা: থিয়েটার ফ্যাক্টরির নবতর যাত্রার অঙ্গীকার ২০ অক্টোবর ২০২৬—নাট্যদল ‘থিয়েটার ফ্যাক্টর...
সত্য বল, সুপথে চল
শাশ্বত এই নীতিবাক্যই ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও বাউল সাধনার মূল ভিত্তি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রথার চেয়ে তিনি...
পাঠকের মন্তব্য
০