সত্য বল, সুপথে চল
শাশ্বত এই নীতিবাক্যই ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও বাউল সাধনার মূল ভিত্তি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রথার চেয়ে তিনি মানুষের ভেতরের নৈতিকতা ও পরম সত্যের সন্ধানকেই সর্বেসর্বা মনে করতেন।
প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর বা ১লা কার্তিক তাঁর তিরোধান দিবসে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়ীতে তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব ও মেলা বসে, যেখানে দেশ-বিদেশের লাখো বাউল-ভক্তের মহামিলন ঘটে। লালন সাঁই কেবল অতীত ইতিহাসের সাধক নন; সংঘাতময় পৃথিবীতে সাম্য, প্রেম, পরম সত্য ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হয়ে তিনি চিরভাস্বর।

মানবতার অন্তরালে সর্বেশ্বরবাদী সুফি সাধক, সমাজ সংস্কারক ও দার্শনিক—ফকির লালন সাঁই ছিলেন অসংখ্য কালজয়ী গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার মরা কালীগঙ্গার তীর ধরে একসময় ভেসে আসত একতারা আর দোতারার মরমি সুর। সেই সুর কেবল সাধারণ গান ছিল না; তা ছিল এক অবিনাশী দর্শনের প্রকাশ—যা জাত, পাত, বর্ণ ও ধর্মের কৃত্রিম বিভেদ ভেঙে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিল। বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ভাবসাধনার শীর্ষমানব লালন ছিলেন বাউল গানের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তাঁর অন্তরের গভীর উপলব্ধি ও মরমি বাণী বাংলাভাষী মানুষের মনে আজও সমানভাবে আলোড়ন তোলে।
লালন সাঁইয়ের জন্মস্থান, জন্মসন কিংবা বংশপরিচয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট দলিল না থাকলেও এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে নানামুখী মতভেদ ও বিতর্ক রয়েছে। তবে লোকশ্রুতি ও বিভিন্ন সূত্র মতে, তরুণ বয়সে তীর্থযাত্রায় বের হয়ে তিনি গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গীরা তাঁকে মৃত ভেবে কালীগঙ্গার তীরে ফেলে রেখে যায়। সে সময় ছেঁউড়িয়া গ্রামের মলম শাহ ও তাঁর স্ত্রী মতিজান বিবি তাঁকে উদ্ধার করে সেবায় সুস্থ করে তোলেন; বসন্ত রোগে লালন একটি চোখ হারান। পরবর্তীতে মলম শাহের মাধ্যমে তিনি সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে এসে দীক্ষা লাভ করেন। বাউল তত্ত্বে গুরুর স্থান ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে এবং গুরুর মাধ্যমেই পরম সত্তাকে উপলব্ধি করা সম্ভব। গুরুর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা থেকেই তিনি গুরুর নামানুসারে নিজের নামের সাথে ‘সাঁই’ পদবি জড়িয়ে ‘ফকির লালন’ বা ‘লালন সাঁই’ নামে পরিচিত হন।
লালন সাঁইয়ের মূল ভাবনা ছিল মানবধর্ম ও অসাম্প্রদায়িকতা। ব্রিটিশ আমলে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ বাড়লে তিনি ছিলেন এর বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি গানে গানে তুলেছেন তীক্ষ্ণ প্রশ্ন—”কেউ মালা কেউ তসবি গলায় / তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায় / যাওয়া কিংবা আসার বেলায় / জাতের চিহ্ন রয় কার রে।” অথবা “সুন্নত দিলে হয় মুসলমান / নারী জাতির কি হয় বিধান / ব্রাহ্মণ চিনি পৈতে প্রমাণ / বামনি চিনি কিসেরে!” জাতপ্রথার কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে তিনি গেয়েছেন—”সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে / লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না তা-নজরে।”
সুফি তত্ত্ব, বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শন ও অদ্বৈতবাদের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছিল তাঁর গানে। একদিকে যেমন গেয়েছেন—”পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়”, তেমনি বৈষ্ণব বাৎসল্য রসে গেয়েছেন—”বলি মা তোর চরণ ধরে / ননী চুরি আর করব না / আর আমারে মারিস নে মা / ননীর জন্যে আজ আমাদের মারলি মাগো বেঁধে ধরে।।”
‘বাও’ মানে বাতাস আর ‘উল’ মানে সন্ধান; শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সাধনাই বাউলদের মূল ভিত্তি। বাউলমতে শাস্ত্রের চেয়ে সত্য বড় এবং প্রথার চেয়ে মানুষ বড়। লালনের ভাবসংগীতে দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক রূপক পরম রূপ পেয়েছে। মানবদেহকে অলৌকিক ঘর বানিয়ে গেয়েছেন—”ধন্য ধন্য বলি তারে। বেঁধেছে এমন ঘর শূন্যের উপর পোসতা করে…” আবার বাতাস ও শ্বাসের সাধনায় বলেছেন—”ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে।” মনের ভেতরে বাস করা পরমাত্মাকে উদ্দেশ্য করে তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টি—”খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়” কিংবা “তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা / মন জানো না…”। আবার আত্মউপলব্ধির সত্য প্রকাশ করে গেয়েছেন—”আমি কি তাই জানিলে সাধন সিদ্ধি হয়, আমি কথার অর্থ ভারি আমাতে আর আমি নাই।” পরমাত্মার সহজ চিত্র ধরেছেন ‘আরশিনগর’ গানে—”আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর / এক পড়শী বসত করে”। গুরুর প্রতি অটল বিশ্বাস প্রকাশে তিনি বলেছেন—”ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার।” জীবনের ক্ষণস্থায়িতায় গেয়েছেন—”আশা পূর্ণ হলো না আমার মনের বাসনা”, আর প্রেমের সাধনায় বলেছেন—”প্রেমের কি সাধ আছে বল, নিন্দার কাঁটা যদি না বিধিল গায়ে।”
লালন একাডেমি ও লোকশ্রুতি মতে, সাঁইজি রাতে দুধ-খই ছাড়া ভারী খাবার খেতেন না। সারারাত জিকির-আসকার, ধ্যানে মগ্ন থাকতেন এবং পান খেতেন। নতুন গানের সুর মাথায় এলে শিষ্যদের ডেকে বলতেন—”পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে।” শিষ্যরা তখন তা লিখে নিতেন।
লালনের সহমর্মী ছিলেন সম্পাদক-সাহিত্যিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার। কাঙ্গালের শিষ্য জলধর সেনের ‘কাঙ্গাল জীবনী’তে লালনের গান গাওয়ার স্মৃতি পাওয়া যায়। লালনের প্রভাবে কাঙ্গালের শিষ্যদের মাধ্যমে তৈরি হয় ‘ফিকির চাঁদ’ বাউলের দল। ১৮৮৫ সালে কাঙ্গাল হরিনাথের ‘কাঙ্গালের ব্রহ্মাণ্ড-বেদ’ গ্রন্থে লালনের জীবদ্দশায় প্রথম গান (‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা’) মুদ্রিত হয়। শিলাইদহে থাকাকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ সালে পদ্মায় বোটে বসে লালন সাঁইয়ের একমাত্র প্রামাণ্য পেনসিল স্কেচটি আঁকেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন এবং লালনের দর্শনে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। কাজী নজরুল ইসলাম ও মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গও লালন দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে গবেষক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাঁর ‘হারামণি’ গ্রন্থে তিন শতাধিক লালন গীতি সংকলন করেন।
লালন দর্শনের এই বৈশ্বিক আকর্ষণের অন্যতম এক উদাহরণ ফরাসি তরুণী দেবোরা কিউকারম্যান (পরবর্তীতে দীক্ষাপ্রাপ্ত নাম ‘দেবোরা জান্নাত’)। পেশায় যোগ ব্যায়ামের শিক্ষক ও দর্শনের শিক্ষার্থী এই নারী লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণা করতে ফ্রান্সে নিজের আলো-ঝলমলে জীবন ছেড়ে প্রথম বাংলাদেশে আসেন। লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেম ও ভাবসাধনায় মুগ্ধ হয়ে তিনি কুষ্টিয়ার সাধক নহির শাহের কাছে দীক্ষা নেন এবং ফ্রান্সে ফিরে না গিয়ে চিরতরে কুষ্টিয়ার আখড়াবাড়ী ও বাউল সঙ্গেই নিজের জীবন সঁপে দেন।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক ১২৯৭) ১১৬ বছর বয়সে ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালন প্রয়াণ করেন। মৃত্যুর আগে পেটের ও গ্রন্থির সমস্যায় ভোগায় তিনি দুধ এবং শেষ মুহূর্তে মাছ খেতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর দিন ভোর ৫টা পর্যন্ত শিষ্যদের সাথে গান গাওয়ার পর “আমি চলিলাম” বলে তিনি চিরবিদায় নেন। তাঁর অন্তিম গানটি ছিল—”পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে। ক্ষম হে অপরাধ আমার এ ভব কারাগারে।।” কোনো ধর্মীয় আচার ছাড়া তাঁর নির্দেশিত আখড়াতেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর ‘হিতকরী’ পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে তাঁকে প্রথম ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
তথ্যসূত্র: মুক্ত বিশ্বকোষ
কে এম হাসান/সাংস্কৃতিক কর্মী/বিজনেস ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল
এ সম্পর্কিত
আন্তর্জাতিক সাইবার হামলার শঙ্কা
ওয়েবসাইট শাটডাউন, জরুরি সতর্কতা বাংলাদেশেও বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত প...
এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর…
লক্ষ্মীপেঁচা শঙ্খচিল রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ হেমন্তের তারাভরা রাতে নিঃশব্দে ফুরিয়েছিল জীবনান...
অন্য কেউ হলে সুইসাইড করতো: চিত্রনায়িকা পরীমনি
সারাজীবন কপালে ঝামেলাই লেখা, এনজয় করি: পরীমনি ফিচার বাংলা ডেস্ক ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত আর নি...
‘থিয়েটার ফ্যাক্টরি’র নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
৯ পেরিয়ে ১০-এ পা: থিয়েটার ফ্যাক্টরির নবতর যাত্রার অঙ্গীকার ২০ অক্টোবর ২০২৬—নাট্যদল ‘থিয়েটার ফ্যাক্টর...
পাঠকের মন্তব্য
০